বশিরুল আলম, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, চুয়াডাঙ্গা:
কোলজুড়ে নবজাতক, চোখে ছিল নতুন জীবনের স্বপ্ন-কিন্তু সেই স্বপ্নের মাঝেই থেমে গেল এক মায়ের জীবন। সন্তান জন্ম দিতে অস্ত্রোপচারের জন্য ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছিলেন সোনিয়া। কিন্তু সিজারিয়ান অপারেশনের কিছু সময় পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে দ্রুত কুষ্টিয়ায় রেফার করা হয়। শেষ পর্যন্ত কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে।
শনিবার দুপুরে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সাকদহচর এলাকার বাসিন্দা সোনিয়া, স্বামী রবি, লোকমান ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য ভর্তি হন। সেখানে চিকিৎসক ডা. নীলুফা ও ডা. দীপুর তত্ত্বাবধানে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয় বলে জানা গেছে। অস্ত্রোপচারের কিছু সময় পরই রোগীর রক্তচাপ কমে যায়। একই সঙ্গে শুরু হয় অতিরিক্ত বমি ও শ্বাসকষ্ট। পরিস্থিতির অবনতি হলে তাঁকে দ্রুত কুষ্টিয়ায় পাঠানো হয়। পরে রাত ১০টা ২০ মিনিটে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
প্রাথমিকভাবে রোগীর রক্তচাপ অতিরিক্ত কমে যাওয়াকে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা ও যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন। অস্ত্রোপচারের পর কী কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
আগেই জরিমানা, ছিল অপারেশন বন্ধের নির্দেশ
ঘটনাটিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে ক্লিনিকটির সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পরিস্থিতি। জানা গেছে, ঘটনার মাত্র দুই দিন আগে ভ্রাম্যমাণ আদালত লোকমান ক্লিনিককে জরিমানা করেন এবং সেখানে অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, নির্দেশনার পরও ক্লিনিকটিতে কীভাবে অস্ত্রোপচার করা হলো? নির্দেশনা অমান্য করা হয়ে থাকলে, এর দায় কার—তা খতিয়ে দেখা জরুরি। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উচিত ক্লিনিকটির কার্যক্রম, অনুমোদন ও নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়টি যাচাই করা।
অ্যানেসথেসিয়া কার্যক্রম নিয়েও যাচাই প্রয়োজন
সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাপদ্ধতিতে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপযুক্ত অ্যানেসথেসিয়া সেবা, দক্ষ জনবল এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ঘটনায় অ্যানেসথেসিয়া প্রদানকারী চিকিৎসকের যোগ্যতা, সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন ও প্রযোজ্য অনুমোদন এবং অস্ত্রোপচার-পরবর্তী চিকিৎসাব্যবস্থা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
একটি মৃত্যুর পেছনের সত্য উদ্ঘাটন হোক
একজন প্রসূতির মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি প্রসূতিসেবা, বেসরকারি ক্লিনিকের তদারকি এবং রোগীর নিরাপত্তা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে। সোনিয়ার স্বজনদের শোকের এই সময়ে প্রয়োজন ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন।
সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের কাছে দাবি উঠেছে, ক্লিনিকটির অনুমোদন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্দেশ, অস্ত্রোপচারের প্রক্রিয়া, অ্যানেসথেসিয়া সেবা এবং রোগীর চিকিৎসার নথি যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হোক। কোনো অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
সোনিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, চিকিৎসায় কোনো অবহেলা ছিল কি না এবং অপারেশন বন্ধের নির্দেশ অমান্য করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই সামনে আসা প্রয়োজন। আর কোনো পরিবার যেন এমন শোকের মুখোমুখি না হয়, সে জন্য প্রসূতিসেবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সম্পাদক মন্ডলী
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ ইউসুফ আলী
হেড অব নিউজ ( মাল্টিমিডিয়া ) : রুবেল আহাম্মেদ নান্নু
Copyright © 2026 আমাদের পত্রিকা. All rights reserved.