বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) বিভিন্ন ক্যাডারে পদোন্নতির ধারাবাহিকতা থাকলেও বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে পদোন্নতিবঞ্চনার চিত্র ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। অন্যান্য ক্যাডারে ৩৭তম বিসিএসের কর্মকর্তারা ২০২৪ সালে এবং ৩৮তম বিসিএসের কর্মকর্তারা ২০২৬ সালে ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পেয়েছেন। বিপরীতে শিক্ষা ক্যাডারের ৩৭তম বিসিএসের অনেক কর্মকর্তা এখনো নবম গ্রেডের প্রভাষক পদে কর্মরত রয়েছেন। এতে একই বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে পদমর্যাদা, আর্থিক সুবিধা ও পেশাগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষা ক্যাডারে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সংকট চলছে। ২০২৫ সালে এক দফায় ১ হাজার ৮৭০ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে ৩৭ ব্যাচ সহ যোগ্যদের পদোন্নতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, সমসাময়িক অন্যান্য ক্যাডারে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতির অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে।
পদসংকটে আটকে প্রথম পদোন্নতি
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে প্রভাষক পর্যায়ে অনুমোদিত পদ রয়েছে ৯ হাজার ৭৮২টি। বিপরীতে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে পদ রয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৪৫১টি। অর্থাৎ প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য নিয়মিত সাংগঠনিক পদসংখ্যা প্রভাষক পদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
এই ব্যবধানের কারণে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেও কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি পাচ্ছেন না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নিয়মিত পদ সৃষ্টি, পদ আপগ্রেডেশন এবং বিকল্প প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।
ডিপিসি সভা শেষ, তবু জিও জারি হয়নি
পদোন্নতি-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে ২০২৬ সালের ১৬, ১৭ ও ২১ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভা অনুষ্ঠিত হয় ৩৭তম বিসিএস এর। কিন্তু সভার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরও পদোন্নতির সরকারি আদেশ বা জিও জারি না হওয়ায় কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
প্রভাষক পরিষদ ও পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের দাবি, ডিপিসির সুপারিশের আলোকে যোগ্য কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতির আদেশ জারি করতে হবে। পাশাপাশি প্রযোজ্য বিধিমালা, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা অনুসারে পদোন্নতি এবং আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
২ হাজার ৮২৩টি সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব
পদস্বল্পতা নিরসনে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে ২ হাজার ৮২৩টি সুপারনিউমারারি বা অতিরিক্ত পদ সৃষ্টির প্রস্তাবের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি এ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি করা হলে নিয়মিত অনুমোদিত শূন্য পদ না থাকলেও নির্ধারিত শর্ত ও বিধি অনুসারে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে দীর্ঘদিনের পদোন্নতি জট কমানোর পাশাপাশি কর্মকর্তাদের পেশাগত অগ্রগতির পথ সুগম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রস্তাবটির চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা প্রয়োজন।
অন্যান্য ক্যাডারের সঙ্গে বৈষম্যের অভিযোগ
শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, একই বিসিএস ব্যাচে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা অন্যান্য ক্যাডারে পদোন্নতি পেয়ে উচ্চতর গ্রেডে দায়িত্ব পালন করলেও শিক্ষা ক্যাডারে অনেককে বছরের পর বছর একই পদে থাকতে হচ্ছে। এর ফলে বেতন-ভাতা, পদমর্যাদা, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ পেশাগত অগ্রগতিতে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময় এই ব্যবধান আরও দৃশ্যমান হতে পারে। তবে এ-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট আর্থিক প্রভাব নির্ধারণে প্রযোজ্য বেতন কাঠামো ও ব্যক্তিভিত্তিক পদোন্নতির তথ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি
পদোন্নতির সরকারি আদেশ জারিসহ দীর্ঘদিনের জট নিরসনের দাবিতে ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের প্রাঙ্গণে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন ৩৬তম, ৩৭তম ও ৩৮তম বিসিএসের পদোন্নতিবঞ্চিত শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে ডিপিসির সভার আলোকে ৩৭ ব্যাচসহ যোগ্য সকলের দ্রুত পদোন্নতির আদেশ জারি, আর্থিক সুবিধাসহ পদোন্নতি নিশ্চিত করা এবং পদস্বল্পতা নিরসনে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি।
স্থায়ী সমাধান চান কর্মকর্তারা
শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি-সংকট কেবল একটি বা দুটি ব্যাচের সমস্যা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ও প্রশাসনিক জটিলতার প্রতিফলন। নিয়মিত পদোন্নতির ব্যবস্থা না থাকা, উচ্চতর পদে পর্যাপ্ত অনুমোদিত পদ না থাকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত ৩৭ ব্যাচের পদোন্নতির জিও জারি, সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির প্রস্তাবের নিষ্পত্তি এবং নিয়মিত পদোন্নতির সময়সীমা নির্ধারণের মাধ্যমে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান করবে।
প্রশ্ন উঠেছে—একই বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তারা যখন অন্যান্য ক্যাডারে পদোন্নতি পেয়ে উচ্চতর গ্রেডে দায়িত্ব পালন করছেন, তখন শিক্ষা ক্যাডারের যোগ্য কর্মকর্তাদের আর কত দিন প্রভাষক পদে অপেক্ষা করতে হবে?
শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে পদোন্নতিবঞ্চনা ও পেশাগত হতাশা আরও বাড়বে, যার প্রভাব পড়তে পারে সরকারি কলেজ ও শিক্ষা প্রশাসনের সামগ্রিক কর্মপরিবেশে।
সম্পাদক মন্ডলী
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ ইউসুফ আলী
হেড অব নিউজ ( মাল্টিমিডিয়া ) : রুবেল আহাম্মেদ নান্নু
Copyright © 2026 আমাদের পত্রিকা. All rights reserved.