মাঠের দুরন্ত অপু থেকে রহস্যময় মৃত্যু
- আপডেট সময় : ০২:১৫:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬ ৮৯ বার পড়া হয়েছে
যে মেয়েটি একসময় ফুটবল মাঠে দুরন্ত গতিতে ছুটে বেড়াত, গোল ঠেকিয়ে কিংবা ডিফেন্স সামলে দলকে এনে দিত বিজয়ের হাসি—সেই কৃতি প্রমিলা ফুটবলার অপু ওরফে জান্নাতুল খাতুনের জীবন থেমে গেল এক রহস্যঘেরা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। খুলনা বিভাগের হয়ে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করা এই তরুণ ফুটবলারের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় শোক, বিস্ময় আর প্রশ্নে স্তব্ধ হয়ে আছে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা।
গতকাল গভীর রাতে আলমডাঙ্গা পৌর এলাকার গোবিন্দপুর মিয়াপাড়ায় স্বামীর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় ১৮ বছর বয়সী জান্নাতুল খাতুনের মরদেহ। বিয়ের মাত্র এক মাসের মাথায় এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী কিংবা এলাকাবাসী। পরিবারের অভিযোগ—এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যা। তবে পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
অপু ছিল আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনপাড়ার রানা ব্যাধের মেয়ে। দুই ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল সবার ছোট, প্রাণবন্ত আর স্বপ্নবাজ। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় ছিল তার অসাধারণ আগ্রহ। আলমডাঙ্গা মডেল স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে আলমডাঙ্গা পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে ২০২৪ সালে এসএসসি পাস করে সে।তবে বইয়ের পাতার চেয়েও ফুটবল মাঠেই যেন বেশি পরিচিত ছিল অপু। ২০১৭ সালে আলমডাঙ্গা ফুটবল একাডেমির অনূর্ধ্ব-১৭ দলে যোগ দিয়ে শুরু হয় তার স্বপ্নযাত্রা।
প্রথমে গোলকিপার, পরে ডিফেন্ডার হিসেবে মাঠে নিজের সাহসী ও লড়াকু উপস্থিতি দিয়ে দ্রুত সবার নজর কাড়ে সে। কোচ ও শিক্ষকদের কাছে অপু ছিল পরিশ্রমী, আত্মবিশ্বাসী এবং অসম্ভব প্রাণোচ্ছ্বল এক মেয়ে।২০২৩ সালে ৫০তম জাতীয় গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় আলমডাঙ্গা পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের হয়ে খেলতে নেমে খুলনা বিভাগকে চ্যাম্পিয়ন করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে অপু। বরিশাল বিভাগকে হারিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে আলমডাঙ্গার মেয়েরা। পরে সিলেটে অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত পর্বেও অংশ নেয় দলটি। ২০২৫ সালেও জেলা পর্যায়ে বিদ্যালয় দলকে জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে সে।
কিন্তু মাঠের সেই হাসিখুশি মেয়েটির জীবন যেন ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনে।
পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, এসএসসি পাসের পর নিজ ধর্মের এক যুবকের সঙ্গে তার প্রথম বিয়ে হয়। প্রায় এক বছর সংসার করলেও পরে আর সেই সংসারে ফেরেননি তিনি। এরপর আলমডাঙ্গার বাবুপাড়ায় এক বান্ধবীর বাসায় থাকতে শুরু করেন অপু।এরই মধ্যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এফিডেভিটের মাধ্যমে নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন জান্নাতুল খাতুন। তার সাবেক শিক্ষক আতিয়ার রহমান জানান, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের বিষয়ে অপু নিজেই আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। পরে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধর্মান্তর সম্পন্ন হয়।
পরবর্তীতে গোবিন্দপুর এলাকার এক পরিবারের বাসায় কয়েক মাস থাকার পর সেই পরিবারের আত্মীয়, গোবিন্দপুর মিয়াপাড়ার আলমের ছেলে রানার সঙ্গে প্রায় এক মাস আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন জান্নাতুল। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীকে স্বাভাবিক ও সুখী দম্পতি হিসেবেই দেখা যেত। ঘটনার দিন সন্ধ্যাতেও দুজনকে শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে দেখা গেছে। তারা একসঙ্গে কেনাকাটা করেছেন, ফুচকা খেয়েছেন, এমনকি বৃষ্টির মধ্যেও হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরেছেন বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অথচ কয়েক ঘণ্টা পরই মিলল জান্নাতুলের ঝুলন্ত মরদেহ।
স্বামী রানার দাবি, গভীর রাতে ঘুম ভেঙে তিনি দেখেন, ঘরের আড়ার সঙ্গে উড়না পেঁচিয়ে ঝুলছেন তার স্ত্রী। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে নিচে নামিয়ে মৃত অবস্থায় দেখতে পান।তবে এই বর্ণনায় বিশ্বাস করতে পারছে না নিহতের পরিবার। জান্নাতুলের মা সুমিতা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,“আমার মেয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না। কিছুদিন আগেও সংসারে অশান্তির কথা বলেছিল। কোরবানির ঈদের পর সব ঠিক না হলে বাড়ি ফিরে আসবে বলেছিল। তার আগেই মেয়েটাকে শেষ করে দেওয়া হলো।”অপুর শিক্ষক ও সহপাঠীরাও হতবাক। তাদের ভাষ্য, সবসময় প্রাণখোলা হাসিতে ভরিয়ে রাখা মেয়েটি এত সহজে জীবন শেষ করে দিতে পারে—এটা তারা মানতেই পারছেন না।
এদিকে ঘটনাস্থল নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয়দের দাবি, যে আড়ার সঙ্গে মরদেহ ঝুলছিল, সেটির উচ্চতা খুব বেশি নয়। ফলে আত্মহত্যার ঘটনাটি নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।আলমডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বানী ইসরাইল বলেন, “গৃহবধূর মৃত্যুর বিষয়টি রহস্যজনক। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”মাঠে বিজয়ের স্বপ্ন দেখা সেই অপুর জীবন আজ থেমে গেছে। কিন্তু তার মৃত্যু কি আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো নির্মম সত্য—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পরিবার, এলাকাবাসী আর পুরো আলমডাঙ্গা।



















