ঢাকা ০১:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬, ২৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে এমপি মাসুদ পারভেজ রাসেল দেশের বাজারে আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরিতে ২,২১৬ টাকা বৃদ্ধি উতরপ্রদেশের যমুনায় নৌকাডুবি! নিখোঁজ ৬ হাউসপুরে রাস্তা নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করলেন এমপি মাসুদ পারভেজ রাসেল ১৬ বছরের নিচে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আইনি নোটিশ আধুনিক ডেইরি ব্যবস্থাপনায় নারী খামারিদের প্রশিক্ষণ দিল ব্র্যাক ‘প্রথম ভালোবাসা নিয়ে ভাইরাল হতে চাই না,’ জানালেন তানজিয়া জামান মিথিলা মেরির মূর্তি অবমাননা বিজেপির জয়ে বিএনপি নেতার অভিনন্দন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসকের সৌজন্য সাক্ষাৎ

জনসেবায় নিবেদিত এক কিংবদন্তি: ডা. রিয়াজউদ্দীন আহমদের গৌরবময় জীবন

বশিরুল আলম, আলমডাঙ্গা (চুয়াডাঙ্গা): 
  • আপডেট সময় : ০১:০০:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬ ২২২ বার পড়া হয়েছে

জনসেবায় নিবেদিত এক কিংবদন্তি: ডা. রিয়াজউদ্দীন আহমদের গৌরবময় জীবন

আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা ব্যক্তিগত খ্যাতি বা সম্পদের জন্য নয়, বরং মানুষের কল্যাণ ও সমাজ পরিবর্তনের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব ছিলেন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার নগর বোয়ালিয়া গ্রামের কৃতি সন্তান ডা. রিয়াজউদ্দীন আহমদ (২৮ সেপ্টেম্বর ১৯০৫ – ১ জানুয়ারি ১৯৯৫)। তিনি ছিলেন চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, রাজনীতিবিদ ও মানবহিতৈষী এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর পেশা ছিল চিকিৎসা, কিন্তু নেশা ছিল মানুষের সেবা। এ কারণে তিনি মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন “রিয়াজ ডাক্তার” নামে।

ডা. রিয়াজউদ্দীন আহমদের বংশধারা ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত। তাঁদের পূর্বপুরুষ মধ্য এশিয়ার খোয়ারিজম সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। মোঙ্গল আক্রমণের পর তাঁদের বংশধররা দিল্লি হয়ে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে এই বংশেরই অন্যতম বীরপুরুষ ছিলেন বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামী নেতা খাজা উসমান খান লোহানী, যিনি মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন যুদ্ধ করে ১৬১২ সালে শাহাদাত বরণ করেন।

এই বংশের পরবর্তী প্রজন্মও দেশ ও মানুষের জন্য সংগ্রামের ঐতিহ্য ধরে রাখে। ইংরেজ শাসনের সময় নীলচাষীদের পক্ষে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে উসমান মাহমুদসহ অনেকেই জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁদের বংশধররা পরবর্তীকালে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়লেও দেশপ্রেম ও সংগ্রামের ধারাটি অটুট থাকে। ১৯০৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার নগর বোয়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ডা. রিয়াজউদ্দীন আহমদ। তাঁর পিতা ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের নেতা ইজ্জতুল্লাহ এবং মাতা জয়তুননেছা বিবি।

তিনি প্রথমে বাড়ির মক্তবে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে মোড়ভাঙ্গা নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাঁশবাড়িয়া উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং চুয়াডাঙ্গা ভি.জে. উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯২৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে প্রথম গ্রেডের মহসিন বৃত্তি লাভ করেন।
পরবর্তীতে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে আইএসসি এবং পরে কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন করেন। চিকিৎসাবিদ্যা সম্পন্ন করে গ্রামে ফিরে এসে তিনি মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ধনী-গরিব, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষকে সমান আন্তরিকতায় চিকিৎসা দিতেন তিনি। অনেক ক্ষেত্রেই দরিদ্র রোগীদের কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক নিতেন না, বরং নিজের অর্থে ওষুধ কিনে দিতেন।

আরও পড়ুন, https://www.dailyamaderpatrika.com/2026/03/15/ফেনীতে-জাল-টাকা-তৈরির-সরঞ/

প্রতিদিন সকালে ডিসপেনসারিতে রোগী দেখার পর তিনি ঘোড়ায় চড়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে গিয়ে রোগীদের চিকিৎসা করতেন। তাঁর মানবিকতা ও সেবার জন্য মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল—
“রিয়াজ ডাক্তার রোগীর দিকে তাকালেই রোগ ভালো হয়ে যায়।”
চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি বুঝতে পারেন শিক্ষার অভাবই সমাজের মূল সমস্যা। তাই শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে তিনি হাট বোয়ালিয়ায় একটি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে হাট বোয়ালিয়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ হিসেবে পরিচিত।
প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে মুসলিম সমাজের একটি অংশ ইংরেজি শিক্ষাকে ধর্মবিরোধী মনে করে বিরোধিতা করলেও তিনি দৃঢ়তার সাথে সেই বাধা অতিক্রম করেন। বিচারপতি ড. রাধাবিনোদ পালসহ বিভিন্ন ব্যক্তির সহযোগিতায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরে তা এলাকার শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ডা. রিয়াজউদ্দীন আহমদ সমাজের কল্যাণে নানা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— হাট বোয়ালিয়া দাতব্য চিকিৎসালয়,  হাট বোয়ালিয়া জামে মসজিদ, কালাজ্বর চিকিৎসা কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন উদ্যোগ,  এছাড়াও তিনি এলাকার খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ডা. রিয়াজউদ্দীন আহমদ রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। তিনি প্রথমে কংগ্রেস রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলেও পরে বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যোগ দেন। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আরও পড়ুন, https://www.dailyamaderpatrika.com/2026/03/15/বাজারে-ভোক্তা-অধিকার-সংর/

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধিকার আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণে তিনি ছিলেন অগ্রণী। পাক হানাদার বাহিনী তাঁর প্রতিষ্ঠিত “হুদা ক্লিনিক” লুট করে ধ্বংস করে দিলেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের কার্যক্রম থেকে পিছিয়ে যাননি।

জীবনের শেষ দিকে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে কিছুদিন শয্যাশায়ী ছিলেন তিনি। ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি সকালে হাট বোয়ালিয়াস্থ নিজ বাসভবন “বাংলাদেশ হাউজে” তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে নগর বোয়ালিয়া গোরস্থানে দাফন করা হয়। জীবদ্দশায় তিনি কবর পাকা না করার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন।
তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর আদর্শকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রিয়াজ ডাক্তার ফাউন্ডেশন, যা শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি ও মানবকল্যাণে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মানুষের সেবা, শিক্ষা বিস্তার এবং সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে ডা. রিয়াজউদ্দীন আহমদ আজও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন। তাঁর জীবন যেন এক অনন্য উদাহরণ— মানুষের জন্য বাঁচা, মানুষের জন্য কাজ করা এবং মানুষের মাঝেই চিরকাল বেঁচে থাকা।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

জনসেবায় নিবেদিত এক কিংবদন্তি: ডা. রিয়াজউদ্দীন আহমদের গৌরবময় জীবন

আপডেট সময় : ০১:০০:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬

বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা ব্যক্তিগত খ্যাতি বা সম্পদের জন্য নয়, বরং মানুষের কল্যাণ ও সমাজ পরিবর্তনের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব ছিলেন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার নগর বোয়ালিয়া গ্রামের কৃতি সন্তান ডা. রিয়াজউদ্দীন আহমদ (২৮ সেপ্টেম্বর ১৯০৫ – ১ জানুয়ারি ১৯৯৫)। তিনি ছিলেন চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, রাজনীতিবিদ ও মানবহিতৈষী এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর পেশা ছিল চিকিৎসা, কিন্তু নেশা ছিল মানুষের সেবা। এ কারণে তিনি মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন “রিয়াজ ডাক্তার” নামে।

ডা. রিয়াজউদ্দীন আহমদের বংশধারা ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত। তাঁদের পূর্বপুরুষ মধ্য এশিয়ার খোয়ারিজম সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। মোঙ্গল আক্রমণের পর তাঁদের বংশধররা দিল্লি হয়ে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে এই বংশেরই অন্যতম বীরপুরুষ ছিলেন বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামী নেতা খাজা উসমান খান লোহানী, যিনি মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন যুদ্ধ করে ১৬১২ সালে শাহাদাত বরণ করেন।

এই বংশের পরবর্তী প্রজন্মও দেশ ও মানুষের জন্য সংগ্রামের ঐতিহ্য ধরে রাখে। ইংরেজ শাসনের সময় নীলচাষীদের পক্ষে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে উসমান মাহমুদসহ অনেকেই জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁদের বংশধররা পরবর্তীকালে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়লেও দেশপ্রেম ও সংগ্রামের ধারাটি অটুট থাকে। ১৯০৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার নগর বোয়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ডা. রিয়াজউদ্দীন আহমদ। তাঁর পিতা ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের নেতা ইজ্জতুল্লাহ এবং মাতা জয়তুননেছা বিবি।

তিনি প্রথমে বাড়ির মক্তবে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে মোড়ভাঙ্গা নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাঁশবাড়িয়া উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং চুয়াডাঙ্গা ভি.জে. উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯২৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে প্রথম গ্রেডের মহসিন বৃত্তি লাভ করেন।
পরবর্তীতে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে আইএসসি এবং পরে কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন করেন। চিকিৎসাবিদ্যা সম্পন্ন করে গ্রামে ফিরে এসে তিনি মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ধনী-গরিব, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষকে সমান আন্তরিকতায় চিকিৎসা দিতেন তিনি। অনেক ক্ষেত্রেই দরিদ্র রোগীদের কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক নিতেন না, বরং নিজের অর্থে ওষুধ কিনে দিতেন।

আরও পড়ুন, https://www.dailyamaderpatrika.com/2026/03/15/ফেনীতে-জাল-টাকা-তৈরির-সরঞ/

প্রতিদিন সকালে ডিসপেনসারিতে রোগী দেখার পর তিনি ঘোড়ায় চড়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে গিয়ে রোগীদের চিকিৎসা করতেন। তাঁর মানবিকতা ও সেবার জন্য মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল—
“রিয়াজ ডাক্তার রোগীর দিকে তাকালেই রোগ ভালো হয়ে যায়।”
চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি বুঝতে পারেন শিক্ষার অভাবই সমাজের মূল সমস্যা। তাই শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে তিনি হাট বোয়ালিয়ায় একটি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে হাট বোয়ালিয়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ হিসেবে পরিচিত।
প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে মুসলিম সমাজের একটি অংশ ইংরেজি শিক্ষাকে ধর্মবিরোধী মনে করে বিরোধিতা করলেও তিনি দৃঢ়তার সাথে সেই বাধা অতিক্রম করেন। বিচারপতি ড. রাধাবিনোদ পালসহ বিভিন্ন ব্যক্তির সহযোগিতায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরে তা এলাকার শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ডা. রিয়াজউদ্দীন আহমদ সমাজের কল্যাণে নানা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— হাট বোয়ালিয়া দাতব্য চিকিৎসালয়,  হাট বোয়ালিয়া জামে মসজিদ, কালাজ্বর চিকিৎসা কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন উদ্যোগ,  এছাড়াও তিনি এলাকার খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ডা. রিয়াজউদ্দীন আহমদ রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। তিনি প্রথমে কংগ্রেস রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলেও পরে বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যোগ দেন। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আরও পড়ুন, https://www.dailyamaderpatrika.com/2026/03/15/বাজারে-ভোক্তা-অধিকার-সংর/

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধিকার আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণে তিনি ছিলেন অগ্রণী। পাক হানাদার বাহিনী তাঁর প্রতিষ্ঠিত “হুদা ক্লিনিক” লুট করে ধ্বংস করে দিলেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের কার্যক্রম থেকে পিছিয়ে যাননি।

জীবনের শেষ দিকে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে কিছুদিন শয্যাশায়ী ছিলেন তিনি। ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি সকালে হাট বোয়ালিয়াস্থ নিজ বাসভবন “বাংলাদেশ হাউজে” তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে নগর বোয়ালিয়া গোরস্থানে দাফন করা হয়। জীবদ্দশায় তিনি কবর পাকা না করার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন।
তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর আদর্শকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রিয়াজ ডাক্তার ফাউন্ডেশন, যা শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি ও মানবকল্যাণে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মানুষের সেবা, শিক্ষা বিস্তার এবং সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে ডা. রিয়াজউদ্দীন আহমদ আজও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন। তাঁর জীবন যেন এক অনন্য উদাহরণ— মানুষের জন্য বাঁচা, মানুষের জন্য কাজ করা এবং মানুষের মাঝেই চিরকাল বেঁচে থাকা।