
স্টাফ রিপোর্টার: সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে এককালীন মূল আমানত তুলতে চাইলে গ্রাহকদের মুনাফা, সুদ বা অন্য আর্থিক সুবিধার দাবি ছাড়তে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে এ নিয়ে কোনো মামলা বা আইনি পদক্ষেপ নেবেন না- এমন অঙ্গীকারনামাতেও সই করতে হচ্ছে তাদের। ফলে অনেক আমানতকারীর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানত ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। আর্থিক অনিয়মে সংকটে পড়া এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই ব্যাংক গঠন করা হয়। বর্তমানে ব্যাংকটির মালিকানা সরকারের হাতে।
ব্যাংকের দুই পৃষ্ঠার ‘আবেদনপূর্বক অঙ্গীকারনামা’ অনুযায়ী, এককালীন মূল টাকা তুলে নিলে সংশ্লিষ্ট হিসাবের ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি’ হয়ে যাবে। এরপর ওই আমানত নিয়ে ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো দাবি, অভিযোগ, মামলা, আবেদন বা আপিল করা যাবে না। এমনকি এই শর্ত আমানতকারীর উত্তরাধিকারী, নমিনি ও আইনগত প্রতিনিধির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
২০ দিনে আবেদন প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ২১ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮২ জন গ্রাহক মোট ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছেন। এর মধ্যে ৯০ হাজার ৯৮ জন গ্রাহক ইতোমধ্যে ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা তুলেছেন।
একই সময়ে ব্যাংকটিতে নতুন আমানত এসেছে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। নতুন ৩২ হাজার ৭৪টি হিসাব খোলা হয়েছে, যেখানে জমা পড়েছে আরো ৩৭৮ কোটি টাকা।
‘হেয়ারকাট’ না থাকার ঘোষণার পরও নতুন শর্ত
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঘোষিত স্কিম অনুযায়ী আমানত ফেরত দিচ্ছে। এর আগে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকদের চিঠি দিয়ে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের স্থিতির ওপর মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। তখন দুই বছরের মুনাফায় ‘হেয়ারকাট’ করার কথা বলা হয়।
তবে, গত ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা দেয়, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের মূল আমানতে কোনো হেয়ারকাট থাকবে না এবং ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি গ্রাহকেরা মূল অর্থ তুলতে পারবেন। এরপরও পুরো মূল টাকা একবারে তুলতে গিয়ে গ্রাহকদের মুনাফা ও ভবিষ্যৎ আইনি দাবি ছাড়ার অঙ্গীকার করতে হচ্ছে।
কী বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “এই ব্যাংকগুলো যাদের ঋণ দিয়েছিল, তারা মুনাফাসহ আসল টাকা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। সেই টাকা ফেরত না পাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে যারা টাকা চাইছেন, তাদের ক্ষেত্রে মুনাফা কেটে রাখা হচ্ছে। সাময়িক সংকট কেটে গেলে অন্যরা মুনাফাসহ টাকা তুলতে পারবেন।”
গ্রাহকদের অভিযোগ
অঙ্গীকারনামার শর্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একাধিক আমানতকারী। নিলয় শাবাব নামের একজন আমানতকারী বলেন, “যে অঙ্গীকারনামা নেওয়া হচ্ছে, তা আমানতকারীদের আর্থিক ক্ষতির কারণ। আমরা এর ন্যায্য সমাধান চাই।”
আরেকজন আমানতকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করে জানান, ৬ সেপ্টেম্বর আবেদন করেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পাননি। বারবার শাখায় যোগাযোগের পরও প্রধান কার্যালয় থেকে অনুমোদন না আসার কথা জানানো হয়েছে।
হেয়ারকাট বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরও শাখায় তা কার্যকর হয়নি। মেয়াদোত্তীর্ণ এফডিআর ও ডিপিএস ভেঙে আংশিক টাকা তুলতে আবেদন করলেও ২০ দিনেও অনুমোদন মেলেনি, এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক গ্রাহক
মুনাফা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ
এদিকে, গত সোমবার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক সব বিভাগীয় প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপকদের চিঠি দিয়ে ব্যক্তিগত মেয়াদি আমানত ও স্কিমভিত্তিক আমানতের মুনাফার হার পুনর্র্নিধারণ এবং স্থিতি পুনর্হিসাবের নির্দেশ দিয়েছে। তবে, নতুন মুনাফার হার এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
একই চিঠিতে মৃত আমানতকারীর হিসাবের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে উত্তরাধিকারী বা বৈধ দাবিদারের কাছে অর্থ ফেরত দেওয়া এবং ব্লক থাকা হিসাবগুলো প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে আনব্লক করে উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।

