ঘরে বসে আয়ের অভিনব প্রতারণার ভয়ংকর ফাঁদ
অনলাইন চাকরি: সর্বশান্ত হয়ে আত্মহুতি দিচ্ছেন অনেক যুবক
- আপডেট সময় : ০৩:৩৮:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬ ৫১ বার পড়া হয়েছে
ঘরে বসে আয়ের সুযোগ করে দেয়ার বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে চাকরির নামে ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। বেকার যুবক-যুবতীরা কর্মসংস্থানের জন্য তাদের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বশান্ত হচ্ছেন। সেই হতাশায় অনেকে আত্মহত্যার পথও বেঁচে নিচ্ছেন। এমন ঘটনা সম্প্রতি রংপুরে ঘটলেও দেশব্যাপি মহামারির আকার ধারণ করেছে।
রংপুর নগরীর শান্তনা ইসলাম (ছদ্মনাম) এমন একটি প্রতারণার ফাঁদে পরে খুইয়েছেন লাখ টাকা। জানা যায়, ই-বায়, ওয়ালমার্ট, জি-মার্কেট, আজকেরডিল, শ্যাইন, কোউপাং নামের কোম্পানীগুলো সাথে বিপণন সম্পৃক্ততা দেখিয়ে ই-বায় মল যার ওয়েবসাইট-আজকেরডিল৮৮.কম নামে একটি কোম্পানীর চাকরির বিজ্ঞাপন ইন্সটাগ্রামে দেখে নক দেন। তাৎক্ষণিক তার সাথে ০১৭৫৪২০৮০২৩ নাম্বার দিয়ে হোয়াটআপ এবং টেলিগ্রামে যোগাযোগ করেন চাকরির নিয়োগ ব্যবস্থাপক পরিচয়ে সুমি আক্তার মিনা (মিনা৮৮০০৯) নিজেকে সিলেটের বাসিন্দা পরিচয়ে একজন নারী। শতভাগ চাকরি নিশ্চিত করে তাকে আবেদন করার জন্য বলা হয়। আবেদন করার পর মিনা নামের ওই নারী যোগাযোগের জন্য জয়নাল নামে আরেকজন মেন্টরকে ইন্সটাগ্রামে ট্যাগ করে দেন। এই মেন্টর চাকরিতে বস হিসেবে দিক নির্দেশনা দিবেন। শুরু হয় ধলশবৎফবধষ৮৮.পড়স এর বনধু গধষষ ঝঃড়ৎ থেকে পণ্য প্রমোশনের কাজ। আপাতত নির্ধারিত বেতন নয় কমিশনে কাজ করতে হবে। চার ঘন্টায় কাজ করে কমিশন যুক্ত হয় ২০০ টাকা। সেই টাকা দিয়ে শুরু হয় টাস্ক পুরণ। চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য কিছু টাস্ক পুরণ করতে বলা হয়। প্রথমে ছোট ছোট টাস্ক দিয়ে ২০০-৫০০ থেকে ১৭০০ টাকা কমিশন তোলার সুযোগ দেয়া হয়। পরে শুরু হয় আবার টাস্ক। টাস্ক পুরণ করে কমিশন জমা হতে থাকে। ০১৬২১১৫৫৪১৯৪, ০১৮৮০৫১৫১৫০, ০১৮৯৭০৭০২১৬,০১৩৩৪৬০৯৮০৪, ০১৯৬৪৯৪৯৬০৬, ০১৯৮৮০৯৮৩৯৮, ০১৯৭২০৩৪০৯৮, ০১১৮৫৪৫৯২০১৩, ০১৭৪২০৬৩৫৩২, ০১৯০২৪১৬৬০১, ০১৯০২৪২৭৫৮৩, ০১৮৭০৯১০৭৯৫ বিকাশ-নগদ নাম্বারে টাকা পাঠিয়ে ধাপে ধাপে টাস্ক পুরণ করে ৩০ হাজার টাকা কমিশন জব একাউন্টে জমা হয়। সেই টাকা উত্তোলন করতে বেশি কমিশনের প্রলোভন দেখিয়ে দেয়া হয় ২২ থেকে ৩০ হাজার টাকার পণ্য ক্রয়ের টাস্ক। সেগুলো পুরণ করে মোট অংকের টাকা ৪১ হাজার কমিশন একাউন্টে জমা হলে উত্তোলন করতে গেলে দেখা যায় ব্যালেন্সটা ফ্রিজ করে দেয়া হয়েছে। আরো দুইটি টাস্ক পুরণ করে সেই টাকাসহ লাখ টাকা উত্তোলনের প্রলোভন দেখানো হয়।
শুধু শান্তনাই নন, তার মতো শত শত তরুনী-তরুণ অনলাইনে চাকরি বা ফ্রিল্যান্সিংয়ের ফাঁদে পড়ে সব হারাচ্ছেন। এই তরুণ-তরুনীদের প্রায় সবাই শিক্ষিত এবং তারা চাকরি খুঁজছিলেন। অনেকে স্বল্প বেতনে চাকরি করলেও আয় বাড়াতে অনলাইনে এমন খণ্ডকালীন চাকরির ফাঁদে পড়ছেন। এর মধ্যে প্রতারকরা হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। পড়াশোনা শেষে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন এক মারুফা নামে এক নারী। জীবনমান উন্নয়নের জন্য হোয়াটসঅ্যাপে খণ্ডকালীন চাকরির অফার পেয়ে রেজিস্ট্রেশন করেন। ভালো আয়ের আশায় দুই দিনেই গচ্ছা দেন ৭০ হাজার টাকা, তাও ঋণ করে। এমনই একটি অফারে সাড়া দিয়ে ৯ লাখ টাকা হারিয়েছেন জাবেদ (ছদ্মনাম)। তাকে ‘অ্যাডভান্স টাস্কস ৪৪৪’ নামের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত করা হয়। সেখানে বিভিন্ন টাস্ক শেষ করে তিনি ৭ হাজার ৮৯৫ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। তারপর ফয়সালকে বলা হয়, ‘সি-ফাইন্যান্স’ নামে একটি সাইটে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। তাকে নয় হাজার টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে বলা হয়। এর কয়েকদিন পর আবারও তাকে ৩৬ হাজার টাকা দিতে বলা হয়। এভাবে অতিরিক্ত সুদসহ ফেরত দেওয়া হবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার কাছ থেকে ৯ লাখ হাতিয়ে নেয় প্রতারকরা।
আরও পড়ুন, https://www.dailyamaderpatrika.com/2026/03/30/আগামী-৩০-এপ্রিল-সিলেট-থেক/
একইরকমভাবে পাঁচ হাজার টাকা হারিয়েছেন নাদিম (ছদ্মনাম)। তাকে শুরুতে দুটি ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে বলা হয়। সাবস্ক্রাইব করে তাদেরকে স্ক্রিনশট পাঠানোর পর তারা তার ফোনে ৩০০ টাকা পাঠায়। এটা ছিল টাস্ক ১। এরকম আরও অনেকগুলো টাস্ক আসতে থাকে। তারা জানায়, পরে ধীরে ধীরে টাকা বাড়ানো হবে। নাদিম জানান, প্রথমে ৩০০ টাকা এবং পরের ধাপে ২০০ টাকা। এভাবে মোট ৫০০ টাকা পাঠানোর পরই বেরিয়ে আসে চক্রটির আসল রূপ। পরবর্তী টাস্ক হিসেবে এবার তারা তাদের কোম্পানিতে বিনিয়োগের অফার করেন। যেই অংক প্যাকেজভেদে ১৬০০ টাকা থেকে শুরু করে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে। আর বিনিয়োগ করলেই ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে সেই টাকা নির্দিষ্ট হারে সুদসহ ফেরত পাওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। যেমন: ১৬০০ টাকা বিনিয়োগ করলে পাওয়া যাবে ২৪০০ টাকা। আর ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৮০০ টাকা বিনিয়োগ করলে দেওয়া হবে ৮ লাখ ৩৮ হাজার ২৪০ টাকা। টেলিগ্রাম গ্রুপটিতে বিনিয়োগের এই টাস্ক দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেখা যায়, গ্রুপে থাকা বিভিন্ন আইডি থেকে একের পর এক বিনিয়োগের টাকা জমা করার স্ক্রিনশট দেওয়া হচ্ছে। চক্রটির বিকাশ নম্বর ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাঠানোর স্ক্রিনশট গ্রুপে দেখা যায়।
আরও পড়ুন, https://www.dailyamaderpatrika.com/2026/03/30/ডিএমপির-নতুন-মুখপাত্র-এন/
সূত্র বলছে, খণ্ডকালীন চাকরি দেওয়ার নামে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন অ্যাপে আসা বিজ্ঞাপনগুলো দেশের বাইরে থেকে চালানো হয়। এতে দেশের কিছু মানুষ জড়িত। তারা এজেন্ট হিসেবে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খোলে। তারা ব্যাংকগুলোতেও অ্যাকাউন্ট খুলে প্রতারণার টাকা আদায় করে। পরে তা চলে যাচ্ছে বিদেশে। খণ্ডকালীন চাকরি বা ফ্রিল্যান্সিয়ের নামে অনলাইনে শত শত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরা নানা কায়দায় প্রতারণা করছে। কেউ কিছু পণ্যের ছবি দিয়ে তা প্রচারের দায়িত্ব দিচ্ছে। বিনিময়ে কিছু টাকা দিচ্ছে। একপর্যায়ে চাকরিপ্রার্থীকে নিজেদের টেলিগ্রাম অ্যাপে যুক্ত করে নানা অফার দিচ্ছে। সেই অফারে বিনিয়োগ করতে বলা হয়। শুরুর দিকে লভ্যাংশ দিলেও পরে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ নিয়ে তারা যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। আরেকটি গ্রুপ সরাসরি অনলাইনে পণ্য কেনাবেচার অফার দিয়ে লভ্যাংশ দিচ্ছে। কয়েক দফা তা দিয়ে বিশ্বাস স্থাপনের পর বড় অঙ্কের বিনিয়োগ নিয়ে কেটে পড়ছে। ইন্টারপোলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ধরনের প্রতারণাকে বলা হয় ‘পিগ বুচারিং ফ্রড’। এটি এক ধরনের ‘ইনভেস্টমেন্ট ফ্রড’ বা বিনিয়োগ প্রতারণা। এ বিষয়ে মামলাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানায় পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা, সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট এবং অ্যান্টি-ট্যারিরিজম ইউনিট।





















