শিক্ষা অফিসে শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষে শূন্যতা
দুই বছর ধরে শিক্ষা অফিসে কর্মরত সহকারী শিক্ষক, শিক্ষক সংকটে ধুঁকছে ফুলবগাদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
- আপডেট সময় : ০৬:০৬:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ ৫৫ বার পড়া হয়েছে
সকাল হলেই গ্রামের কোমলমতি শিশুরা বই-খাতা হাতে ছুটে আসে বিদ্যালয়ে। স্বপ্ন দেখে নতুন কিছু শেখার, শিক্ষকের মুখ থেকে জ্ঞানের আলো পাওয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্নের মাঝেই যেন নেমে এসেছে এক নীরব বঞ্চনা। শিক্ষক আছেন, বেতনও পাচ্ছেন সরকারের কাছ থেকে, অথচ তিনি নেই শ্রেণিকক্ষে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা শিক্ষা অফিসে। ফলে শিক্ষক সংকটে ধুঁকছে বিদ্যালয়, আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ফুলবগাদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এমনই এক বাস্তব চিত্র সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পলাশ ২০২৪ সাল থেকে কোনো দৃশ্যমান সরকারি আদেশ ছাড়াই উপজেলা শিক্ষা অফিসে কর্মরত রয়েছেন। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করে অফিসের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক সংকটে ভুগছে।
আরও পড়ুন, https://www.dailyamaderpatrika.com/2026/06/16/আলমডাঙ্গায়-বিএনপি-নেতার/
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদ্যালয়ে মোট পাঁচজন শিক্ষক থাকার কথা। বর্তমানে প্রধান শিক্ষক ছুটিতে রয়েছেন। অপরদিকে সহকারী শিক্ষক পলাশ শিক্ষা অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে মাত্র তিনজন শিক্ষককে পুরো বিদ্যালয়ের পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সামলাতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
সহকারী শিক্ষক পলাশের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “২০২৪ সালে তৎকালীন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শামসুজ্জোহা স্যার আমাকে শিক্ষা অফিসে নিয়ে আসেন। তারপর থেকেই আমি এখানে কাজ করছি। প্রধান শিক্ষক যদি আমাকে বিদ্যালয়ে যেতে বলতেন, তাহলে অফিসের সঙ্গে কথা বলে ক্লাস নিতে যেতে পারতাম।” তার এই বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে—একজন শিক্ষক কীভাবে বছরের পর বছর শিক্ষা অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন? এর পেছনে কোনো সরকারি অনুমোদন, প্রেষণ বা সংযুক্তিকরণের আদেশ আছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও) সেলিম রেজার সঙ্গে কথা হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “আমি মাত্র সাত মাস আগে এখানে যোগদান করেছি। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতাম না। প্রধান শিক্ষক ছুটিতে যাওয়ার সময় বিদ্যালয়ে কতজন শিক্ষক রয়েছেন, সে তথ্যও আমাকে জানাননি। এখন আপনার মাধ্যমে জানতে পারছি যে বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক দীর্ঘদিন শিক্ষা অফিসে কর্মরত রয়েছেন। বিষয়টি আগে জানা থাকলে আমি তাকে বিদ্যালয়ে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নিতে পারতাম।”
আরও পড়ুন, https://www.dailyamaderpatrika.com/2026/06/16/কৃষির-সমৃদ্ধিতে-সার-ব্যব/
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুবিন হোসেন বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,”বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের। বর্তমানে তিনজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে। সহকারী শিক্ষক পলাশ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা অফিসে কর্মরত। তবে তিনি কোন আদেশে বা কীভাবে সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন, সে বিষয়ে আমার জানা নেই। একজন শিক্ষক বিদ্যালয়ের বাইরে থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম অবশ্যই ব্যাহত হচ্ছে।”
স্থানীয় অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি গ্রামের বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট থাকলেও যদি শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে অফিসে বসে কাজ করেন, তাহলে শিশুদের শিক্ষার মান কীভাবে উন্নত হবে? তাদের দাবি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করা। সেখানে একজন শিক্ষককে বছরের পর বছর অফিসে বসিয়ে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন অভিভাবক আক্ষেপ করে বলেন,”আমাদের সন্তানরা প্রতিদিন স্কুলে যায় শিক্ষকের কাছে পড়তে। কিন্তু শিক্ষক যদি অফিসে থাকেন, তাহলে শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়বে কে?”
আরও পড়ুন, https://www.dailyamaderpatrika.com/2026/06/16/ঝিনাইদহে-বিপুল-পরিমাণ-মা/
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর জীবনের ভিত্তি। এই পর্যায়ে পাঠদানে ঘাটতি তৈরি হলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বহন করতে হয়। শিক্ষক সংকটের মধ্যেও কোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষককে দীর্ঘদিন অফিসের কাজে নিয়োজিত রাখা শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফুলবগাদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা হয়তো এসব প্রশাসনিক জটিলতা বোঝে না। তারা শুধু জানে, তাদের একজন শিক্ষক আছেন, যিনি অনেকদিন ধরে তাদের ক্লাসে আসেন না। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে বসে তারা অপেক্ষা করে—হয়তো আজ স্যার আসবেন, হয়তো আজ নতুন কিছু শেখাবেন।
কিন্তু সেই অপেক্ষা যেন দিন পেরিয়ে মাস, মাস পেরিয়ে বছর ছুঁয়েছে। এলাকাবাসী, অভিভাবক ও সচেতন মহল দ্রুত বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, শিক্ষা অফিস নয়—শিক্ষকের প্রকৃত কর্মস্থল হোক শ্রেণিকক্ষ; কারণ একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া শিক্ষাজীবন কোনো অফিসের ফাইলে ফিরে আসে না।




















