নতুন সরকার, নতুন কূটনৈতিক ভারসাম্যের পথে বাংলাদেশ
- আপডেট সময় : ১২:৫৪:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৬৯ বার পড়া হয়েছে
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ১৮ মাসের মাথায় বাংলাদেশে একটি উৎসবমুখর সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটযুদ্ধে নেমে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে নতুন সরকার। নির্বাচনে জনগণ এমন একজন নেতাকে বেছে নিয়েছে যিনি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আমূল পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে নতুন ভারসাম্য তৈরির প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছেন।বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার পর, তারেক রহমান তার দলকে বিশাল বিজয় এনে দিয়েছেন। ২০২৪ সালে বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মম দমন-পীড়নের পর যেখানে প্রায় ১ হাজার ৪ শতাধিক মানুষ নিহত হন, জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ একটি শক্তিশালী বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয় এবং হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে সেই অস্থিরতা চূড়ান্ত রূপ পায়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বর্তমানে দিল্লিতে নির্বাসনে আছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার অনুপস্থিতে বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে এই রায় একটি নতুন কূটনৈতিক টানাপড়েনের জন্ম দিয়েছে। কারণ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুরোধ সত্ত্বেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার; যাকে দীর্ঘদিন ধরে হাসিনার প্রধান বহিঃশক্তির সমর্থনকারী হিসেবে দেখা হতো, তাকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বিষয়টি দুই দেশের মধ্যকার আগে থেকেই নড়বড়ে সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে অনেক বিশ্লেষক দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে এটি শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি নয়াদিল্লির দীর্ঘমেয়াদি সমর্থনেরও স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান। ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখলেও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পরিধি বিস্তৃত করেন। তার বিরুদ্ধে বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ছিল নিয়মিত। আঞ্চলিক কূটনীতিতে হাসিনা সরকার ভারতের দিকে ঝুঁকে ছিল, যা তার ১৫ বছরের শাসনামলে নয়াদিল্লিতে সাতবার দ্বিপাক্ষিক সফরকে প্রতিফলিত হয়।
নিরাপত্তা সহযোগিতা ছিল সবচেয়ে আলোচিত ক্ষেত্র। শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশে সক্রিয় ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয় এবং নজিরবিহীন মাত্রায় গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান চালু করে। এতে নয়াদিল্লির সমর্থন মিললেও দেশে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত গণ-আলোচনা হয়নি। সংযোগ ব্যবস্থায়ও ভারসাম্যহীনতা দেখা যায়। কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়ে ঢাকা কখনো প্রকাশ্যে ভারতের বিরোধিতা করেনি। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল পরিমিত রাষ্ট্রনীতি, কিন্তু বিরোধীদের কাছে এটি ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণহীনতা। ক্ষমতাচ্যুতির পর হাসিনার দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া সেই ধারণাকে আরও জোরালো করে। তবে শেখ হাসিনার বিদায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। ১৪ বছর পর করাচিতে সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়। ১৩ বছর পর পাকিস্তানি মন্ত্রীরা সফরে আসেন। সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা পুনরায় শুরু হয় এবং বাণিজ্য ২৭ শতাংশ বাড়ে।
তারেক রহমান ইতোমধ্যে দিল্লি ও ইসলামাবাদ উভয় রাজধানী থেকেই শুভেচ্ছা বার্তা পেয়েছেন। তবে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে ভারতের অস্বীকৃতি রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচনী রায় দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন ভাবনার দরজা খুলেছে। অঞ্চলটি আর কোনো একক শক্তির পেছনের উঠান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। বাংলাদেশ সম্ভবত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে, তবে একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াবে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণও এই পরিবর্তনের অংশ হতে পারে। শেষ পর্যন্ত হয়তো বাংলাদেশ নিজস্ব স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে।
























