বিষদ বিবরণে উঠে এলো প্রশ্ন: এ কেমন পিতা?
- আপডেট সময় : ০৩:০৯:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ মে ২০২৬ ৪৪ বার পড়া হয়েছে
বৈশাখের তপ্ত দুপুর। ঝাঁঝালো রোদের দহন যখন জনজীবনকে প্রায় স্থবির করে তুলেছে, ঠিক সেই সময় আলমডাঙ্গার মুন্সিগঞ্জ এলাকায় ঘটে যায় এক ঘটনা—যা শুধু চুরির কাহিনি নয়, বরং মানবিকতা, পিতৃত্ব এবং সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। প্রথম দেখায় দৃশ্যটি ছিল একেবারেই স্বাভাবিক—একজন বাবা, পাশে তার ছোট্ট মেয়ে, সঙ্গে কয়েকটি ছাগল। কিন্তু এই সাধারণতার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক পুরোনো অপরাধ কৌশল। স্থানীয়দের সন্দেহের সূচনা হয় ঠিক এই অস্বাভাবিক স্বাভাবিকতাকে ঘিরেই।
জানা যায়, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ডা. মুহাম্মাদ হুমায়ন কবীরের বাড়ি থেকে ৭টি ছাগল নিয়ে যাওয়ার সময় এলাকাবাসীর নজরে পড়েন পোড়াদাহ চিৎলা গ্রামের লাবলু বিশ্বাস (৩০)। তার সঙ্গে ছিল তার কন্যা। প্রথমে কেউ বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিলেও ধীরে ধীরে সন্দেহ ঘনীভূত হয়। এরপরই শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ—যেখানে ভেঙে পড়ে তার সাজানো গল্প। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, লাবলু বিশ্বাসের এই কৌশল নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই সে পরিবারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে চুরি করে আসছিল। কখনও স্ত্রী, কখনও সন্তান—যেন পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করে সন্দেহ এড়িয়ে যাওয়া যায়। সমাজের বিশ্বাসকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছিল তার এই প্রতারণার জাল। তবে এবার আর শেষ রক্ষা হয়নি। সন্তোষজনক উত্তর দিতে ব্যর্থ হলে ক্ষুব্ধ জনতা তাকে গণধোলাই দেয়। পরে মুন্সিগঞ্জ ক্যাম্প পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পূর্বের সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে মিলিয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়—এ ব্যক্তি সেই একই চোরচক্রের সদস্য।
আরও পড়ুন, https://www.dailyamaderpatrika.com/2026/05/03/ফেনীতে-গনভোটের-রায়-বাস্/
কিন্তু এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশটি উঠে আসে একটি নিষ্পাপ কণ্ঠ থেকে। লাবলুর ছোট্ট মেয়ে জানায়, তার বাবা তার মাকে তালাক দিয়েছেন। এরপর থেকেই তাকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ায় এবং চুরির কাজে ব্যবহার করে। শিশুটির সরল স্বীকারোক্তি মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দেয় উপস্থিত সবাইকে। ক্ষোভ, বিস্ময় আর বেদনায় অনেকে প্রশ্ন তোলেন— “একজন বাবা কীভাবে নিজের সন্তানকে অপরাধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে?”এ ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয় বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।
কয়েকদিন আগেই এরশাদপুর-গোবিন্দপুর এলাকা থেকে ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলামের চারটি ছাগল চুরির ঘটনায় যে সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়েছিল, সেখানে একই কৌশলের প্রতিফলন দেখা যায়। এছাড়া, প্রায় ১৫ দিন আগে মুন্সিগঞ্জের রিয়াজ মিস্ত্রীর পাঁচটি ছাগল চুরির ঘটনাতেও একই চক্র জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিকে থানায় নেওয়া হয়েছে এবং মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি তার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এটাই লাবলুর প্রথম অপরাধ নয়। ২০২৫ সালের ২৭ জুন আলমডাঙ্গা স্টেশন এলাকায় একই কৌশলে ছাগল চুরির সময় সে ধরা পড়েছিল। সেদিনও স্ত্রী-সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করলেও জনতার সন্দেহে আটক হয়।
আরও পড়ুন, https://www.dailyamaderpatrika.com/2026/05/03/বিশ্বমুক্ত-গণমাধ্যম-দিবস/
এই ঘটনাগুলো যেন একটি বৃহত্তর প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়। দারিদ্র্য কি সত্যিই একজন মানুষকে এতটা নির্মম করে তোলে? নাকি এটি কেবলই পেশাদার অপরাধের নির্মম রূপ—যেখানে মানবিক সম্পর্ক, এমনকি নিজের সন্তানের নিষ্পাপতাও হয়ে ওঠে স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার? সমাজের কাছে উত্তর এখনো অজানা। তবে প্রশ্নটি থেকে যায়—এ কেমন পিতা?




















